এটি কেবল হার্ডওয়্যার শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেমিকন্ডাক্টর, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ ও টেলিকম খাতের মতো বিশাল সব শিল্পকেও সরাসরি প্রভাবিত করে। সম্প্রতি বাজারটিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি)। প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ল্ডওয়াইড কোয়ার্টারলি মোবাইল ফোন ট্র্যাকারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্মার্টফোন বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ কমতে পারে।
আইডিসি জানিয়েছে, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন বিক্রির পরিমাণ ১১০ কোটি ইউনিটে নেমে আসতে পারে। যদি এ পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে এটি হবে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে স্মার্টফোন বাজারের সবচেয়ে বড় পতন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী তীব্রতর হতে থাকা মেমোরি চিপ সংকটের কারণেই স্মার্টফোন বাজারের এ করুণ দশা। ফলে গত নভেম্বরের ইতিবাচক পূর্বাভাসকে বর্তমান চিপ সংকট পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। পাশাপাশি বাজারকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্ববাজারে ডিআরএএম বা কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের প্রধান মেমোরির সক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু র্যামের উচ্চমূল্য এখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউন্টারপয়েন্ট হ্যান্ডসেট মডেল সেলস ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন র্যামের গড় সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪ জিবি, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৪ জিবি। কিন্তু বর্তমানে একটি স্মার্টফোন তৈরির মোট খরচের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে মেমোরি কিনতে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে আইফোন ১২ প্রো ম্যাক্স তৈরির মোট খরচের মাত্র ৮ শতাংশ যেত মেমোরির পেছনে। অথচ ২০২৫ সালে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ক্ষেত্রে এ খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশের বেশি।
স্মার্টফোন বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সাময়িক সংকট হিসেবে দেখছে না বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইডিসি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ল্ডওয়াইড ক্লায়েন্ট ডিভাইসেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো এ পরিস্থিতিকে ‘মেমোরি সাপ্লাই চেইন থেকে সৃষ্ট এক শক্তিশালী সুনামি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ ধাক্কার প্রভাব পুরো কনজিউমার ইলেকট্রনিকস শিল্পেই ছড়িয়ে পড়ছে।
ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন বাজার, বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন নির্মাতারা এখন এক বড় হুমকির মুখে। মূলত সাশ্রয়ী ফোনের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করা কোম্পানিগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যন্ত্রাংশের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে ফোন নির্মাতাদের মুনাফার হার বা ‘মার্জিন’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে দেয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।
আইডিসির সিনিয়র রিসার্চ ডিরেক্টর নাবিলা পোপাল বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে অনেক ছোট কোম্পানি বাজার থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হবে। বিশেষ করে কম দামি ফোন বিক্রি করা ব্র্যান্ডগুলো একদিকে যেমন যন্ত্রাংশের সংকটে পড়বে, অন্যদিকে ফোনের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের কেনার ক্ষমতাও কমে যাবে। ফলে কোম্পানিগুলোর সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে।’
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেমোরি চিপের দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা আগের মতো সস্তা অবস্থায় আর ফিরবে না। ফলে ১০০ ডলারের নিচের (প্রায় ১৭ কোটি ১০ লাখ ডিভাইসের বাজার) স্মার্টফোন উৎপাদন করা কোম্পানিগুলোর জন্য স্থায়ীভাবে অলাভজনক হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর স্মার্টফোন বিক্রিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা। এসব অঞ্চলে স্মার্টফোন সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ কমতে পারে।